16 Jan 2021 - 02:48:43 am। লগিন

Default Ad Banner

বাংলাদেশে অবৈধ বিদেশি ১০ লাখ

Published on Sunday, September 29, 2019 at 12:13 pm 76 Views

এমসি ডেস্কঃ দেশে দিন দিন বাড়ছে অবৈধ বিদেশির সংখ্যা। রোহিঙ্গা ও বিহারি ছাড়া একটি গোয়েন্দা সংস্থার হিসাবে অবৈধ বিদেশির সংখ্যা মাত্র ২১ হাজার। কিন্তু বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বলছে, শুধু বিদেশি অবৈধ শ্রমিকের সংখ্যা বাংলাদেশে ১০ লাখ। একাধিক বেসরকারি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, শরণার্থী রোহিঙ্গা, বিহারি এবং অবৈধ বিদেশি মিলিয়ে এ সংখ্যা হবে ৩০ লাখের বেশি। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, নজরদারি অপেক্ষাকৃত কম থাকায় বিদেশিরা পর্যটন ভিসায় এসে পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলে থেকে যাচ্ছেন বাংলাদেশে। অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার পরিসংখ্যানে এত ফারাক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তারা বলছেন, অভিবাসীদের সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়তে পারে। দ্রুততর সময়ের মধ্যে অভিবাসী নিয়ে একটি বিশেষায়িত সংস্থা গঠন করার ব্যাপারে মত দিয়েছেন তারা। অভিবাসন নিয়ে কাজ করেন এমন অনেক বিশ্লেষক বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিহারিদের যন্ত্রণা সহ্য করছে রাষ্ট্র। এবার যোগ হয়েছে বিশাল রোহিঙ্গা-বহর। অবৈধ বিদেশির সংখ্যা বাড়তে থাকায় চাপ পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। অবৈধ বিদেশিরা দেশে অবস্থান করে নানা অপকর্মে জড়াচ্ছেন। এর বাইরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে কাজ করায় বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রাষ্ট্র।

অপরাধবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি যখন সুইজারল্যান্ডে ছিলাম তখন তিন মাস অন্তর অন্তর সেখানকার ইমিগ্রেশন বিভাগ আমার কাছে চিঠি পাঠাত এবং আমাকে তাদের অফিসে ডাকত। বিদেশিদের বিষয়টি মনিটরিংয়ের জন্য আমাদের দেশেও বিশেষায়িত একটি সংস্থা প্রয়োজন। যারা কেবল এ কাজটিই করবে। নয় তো এর দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।’

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দেশে ৩০ লাখ বিদেশি বসবাস করছেন। এর মধ্যে ১০ লাখের বেশি বিদেশি শ্রমিক অবৈধভাবে কাজ করছেন বাংলাদেশে। সবচেয়ে বেশি বিদেশি শ্রমিক কাজ করেন পোশাক খাতে। যদিও একটি গোয়েন্দা সংস্থার হিসাব বলছে, অবৈধভাবে দেশে অবস্থান করা বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা মাত্র ২০ হাজার ৭১৩ জন। বৈধভাবে দেশে অবস্থান করছেন প্রায় ৬১ হাজার। তবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ২০১৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৫ লাখ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে কাজ করেন। তারা তাদের দেশে এক বছরে ৩ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সমান।

এ ছাড়া ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টার তাদের গবেষণায় উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকেরা বৈধ পথে বছরে প্রায় ২০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় নিয়ে যান, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে এসব বিদেশি নাগরিক কাজ করেন।

অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাসকারীদের মধ্যে পাকিস্তান, ভারত, নাইজেরিয়া, ঘানা, কঙ্গো, তাইওয়ান, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, আলজেরিয়া, চীন, তানজানিয়া, আফ্রিকা, উগান্ডা ও শ্রীলঙ্কার নাগরিকরাই বেশি। সব মিলিয়ে প্রায় ৫৫টি দেশের নাগরিক বাংলাদেশে কাজ করলেও গেল আগস্ট পর্যন্ত একটি গোয়েন্দা সংস্থার হিসাবে ভারতের ১০ হাজার ২২৭ জন, চীনের ৩ হাজার ৬৫২, নেপালের ১ হাজার ৫১৮, পাকিস্তানের ৪২১, শ্রীলঙ্কার ৫৩৪, রাশিয়ার ৩৪৮, দক্ষিণ কোরিয়ার ৬১০, উত্তর কোরিয়ার ৪০৬, সোমালিয়ার ১২২, যুক্তরাষ্ট্রের ৪১৫ এবং যুক্তরাজ্যের ২০৩ জন অবৈধ নাগরিক বাংলাদেশে অবস্থান করছেন।

এসব দেশের বৈধ নাগরিক রয়েছেন ভারতের ১০ হাজার ৪৮৩, চীনের ৬ হাজার ২৮১, নেপালের ১ হাজার ২১১ জন, পাকিস্তানের ৫১৭, রাশিয়ার ৪৪৩, শ্রীলঙ্কার ১ হাজার ৫৫৮, যুক্তরাজ্যের ২ হাজার ৬২৭ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৪ হাজার ৪৯৬ জন।

এদিকে একাধিক শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, গার্মেন্ট, কম্পোজিট টেক্সটাইল মিল, ওভেন ও নিটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি, সোয়েটার ফ্যাক্টরি, বায়িং হাউস, মার্চেন্ডাইজিং কোম্পানি মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ বিদেশি কাজ করেন পোশাক খাতে। যদিও অধিকাংশ অবৈধভাবেই কাজ করছেন। এ ছাড়া ফ্যাশন হাউস, খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনকারী কোম্পানি, ফার্নিচার কোম্পানি, পোলট্রি খাদ্য উৎপাদন প্রতিষ্ঠান, চামড়াজাত প্রতিষ্ঠান এবং রিসার্চ প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন অনেক অবৈধ বিদেশি।

এদিকে সম্প্রতি অবৈধ অভিবাসী নিয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দেখুন, এ বিষয়টি মূলত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেখে থাকে। আটকে পড়া পাকিস্তানিদের তো পাকিস্তান নিতে চাইছে না।’ সিপিডি এবং অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব।’

জানা গেছে, বিদেশি নাগরিকদের কাজের অনুমতি দেয় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ও এনজিওবিষয়ক ব্যুরো। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই অনুমতি নেওয়া হয় বিডার কাছ থেকে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত বিডায় নতুন ও মেয়াদ বৃদ্ধিসহ নিবন্ধিত শ্রমিক প্রায় ২৩ হাজার ৮৫৪ জন। জানা গেছে, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোতে আড়াই হাজারের মতো বিদেশি নাগরিক কাজ করেন। এনজিও ব্যুরোর অনুমতি নিয়েও কাজ করা বিদেশি কর্মীর সংখ্যা পাঁচশর বেশি।

বিদেশি কর্মীর ওয়ার্ক পারমিট দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী সদস্য নাভাস চন্দ্র ম ল বলেন, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত শিল্প অধিশাখায় নতুন এবং মেয়াদ বৃদ্ধিসহ মোট ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে ১৪ হাজার ৯১ জন কর্মীর। এ ছাড়া একই সময়ে বাণিজ্য অধিশাখায় নতুন এবং মেয়াদ বৃদ্ধিসহ মোট ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে ৯ হাজার ৭৬৩ জন কর্মীর।

এদিকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদে বাংলাদেশে ৮৫ হাজার ৪৮৬ জন বিদেশি নাগরিক কাজ করেন বলে তথ্য দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

রোহিঙ্গা ১৫ লাখ : বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা কত? এ নিয়ে নানা কথা রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ১৮ হাজার ২৫৯ জন। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হিসাব (আগস্ট পর্যন্ত) অনুযায়ী, রোহিঙ্গার সংখ্যা ৯ লাখ ১৩ হাজার ৮০ জন। এর মধ্যে রেজিস্টার্ড ৩৪ হাজার ৬৬৫ জন এবং গণনাকৃত ৮ লাখ ৭৮ হাজার ৪১৫ জন। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা এখন ১৫ লাখের বেশি। ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আসে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। এর আগে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা ১৯৭৮ সাল থেকে কয়েক ধাপে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

স্থানীয় ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ সালে যারা বাংলাদেশে এসেছিল তারা ওই সময় অনেকেই ভোটার হয়েছিলেন। এ ছাড়া ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে তৈরি করা ভোটার তালিকায় সেই প্রমাণ পাওয়া যায়। দেখা গেছে, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রতিটি আসনে অস্বাভাবিক হারে ভোটরসংখ্যা বেড়েছিল। যদিও ২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা করার সময় নির্বাচন কমিশন অনেক রোহিঙ্গাকে বাদ দিয়েছে।

বিহারির সংখ্যা ৫ লাখ : ১৯৯২ সালে মক্কাভিত্তিক রাবেতা আল ইসলাম নামে একটি এনজিও বাংলাদেশে বসবাসকারী উর্দুভাষী বিহারিদের ওপর জরিপ পরিচালনা করে। জরিপ অনুযায়ী, ওই সময় দেশের ১৭ জেলার ৭০টি ক্যাম্পের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ সাড়ে ৩৭ হাজার। বর্তমানে এ সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন এসপিজিআরসির (স্ট্রান্ডেড পাকিস্তানিজ জেনারেল রিপ্যাট্রিয়েশনস কমিটি) সাধারণ সম্পাদক এম শওকত আলী।

তার দাবি, হাই কোর্টের রায় অনুযায়ী বিহারিদের নাগরিকত্ব দেওয়া হলেও তারা নাগরিকের কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না। গেজেট না হওয়ায় পাসপোর্ট অধিদফতর তাদের পাসপোর্ট করতে অনুমতি দিচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমাদের আটকে পড়া পাকিস্তানি বলা হলেও আসলে আমাদের পূর্বপুরুষরা এসেছিলেন ভারতের বিহার, পাটনা ও উড়িষ্যা থেকে। নানা নির্যাতনের কারণেই তো তারা ভারত ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন।’

কর ফাঁকিতে জড়িত ৭২ হাজার বিদেশি : বাংলাদেশে ৮৫ হাজারের বেশি নিবন্ধিত বিদেশি ব্যবসাসহ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত। তাদের মধ্যে মাত্র ১৩ হাজার বিদেশি আয়কর দেন। অর্থাৎ বাকি সাড়ে ৭২ হাজার বিদেশি কর ফাঁকিতে জড়িত। জানা গেছে, প্রতিবছর ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দিতে হচ্ছে কর্মরত বিদেশিদের। অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের ৩০ শতাংশই নিয়ে যাচ্ছেন বিদেশিরা।

জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী দেশে ৮৫ হাজার ৪৮৬ জন বিদেশি নাগরিক কর্মরত থাকলেও বিদেশিদের জন্য নির্ধারিত ঢাকার কর অঞ্চল-১১-তে প্রায় ১৩ হাজার বিদেশি রিটার্ন জমা দেন। এটিকে বিদেশে পাঠানো রেমিট্যান্সের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

Default Ad Banner

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *