30 Nov 2020 - 02:21:32 am। লগিন

Luster IT

ফুলবাড়ীর এক জয়িতার গল্প…. জীবন যুদ্ধে এক সফল নারী দুলালী…

Published on Thursday, November 19, 2020 at 10:29 pm 456 Views
 লিমন হায়দারঃ জন্মদাতা পিতার ঘরে বেশ আদর-স্নেহে বড় হন দুলালী আরা। সংসারে অভাব ছিলনা তাই পিতার ঘরে সুখেই ছিলেন দুলালী। অন্যান্য সন্তানদের চেয়ে তাকে একটু বেশি আদর করতেন বলেই সেজন্য হয়তো বাবা-মা  আদর করে নামটিও রেখেছিলেন দুলালী।
বিয়ের পর দুলালীকে কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হবে সেটা কি কেউ জানতো। জানলে হয়তো তার পিতা-মাতা ও সেখানে বিয়ে দিতেন না। খুব অল্প বয়সে ফুলবাড়ীর খয়েরবাড়ীর বালুপাড়ায় মোখলেসুর রহমান নামে এক বেকার ছেলের সাথে তার বিয়ে হয়। দুলালী বা তার পরিবার বিয়ের পূর্বে জানতো না! মোখলেছুর রহমান অসুস্থ। বিয়ের কয়েক মাসের মাথায় বোঝা গেল সে শারিরিক ভাবে ভিষণ অসুস্থ।  সংসার চলবে কি করে এই চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে পড়েন দুলালী। এদিকে শত প্রতিকূলতার পরও সে পড়ালেখা চালিয়ে যায়। যার ফলস্বরূপ সে বিয়ের পর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়। একটা মানুষের মনোবল কতটা শক্ত ও দৃড় হলে সেটা সম্ভব!
 মানুষের জীবনের চলার পথে আসে নানা ধরনের বাধা। তাই বলে কি জীবন থেমে থাকে?বা থেমে থাকতে পারে? কিছু সংখ্যক মানুষ আছেন যারা সব বাধার মুখোমুখি হয়ে এগিয়ে যান সামনের দিকে। অর্জন করেন একাধিক সফলতা। সমাজে হয়ে ওঠেন একজন সংগ্রামী জয়ীতা।
নিজের অদম্য মনোবল কে সম্বল করে চরম প্রতিকূলতাকে জয় করে জয়িতারা তৃণমূল থেকে সবার অলক্ষ্যে সমাজে নিজের জন্য স্থান তৈরি করে নেন। দুলালীরা থেমে  থাকবার পাত্র নন। সংসারের করুন পরিস্থিতিতে সে ব্রাক ও সিঙ্গার কোম্পানির যৌথ প্রযোজনায় একটি প্রজেক্টে দুইবছর প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সেখান থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে পরিবার চালিয়েছেন। পাশাপাশি স্বামীর ভিটেয় তিন রুমের একটি পাকা বাড়িও নির্মাণ করেছেন। নিজের বড় ছেলেকে রংপুরের মত একটি বড় জায়গায় প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আলেম বানানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ছোট ছেলেকে ফুলবাড়ীর প্রথম সারির একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াচ্ছেন। ছেলে দুটিকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেন তিনি।  যেন তারা বড় হয়ে দেশ ও দশের উপকারে আসতে পারে। এছাড়াও গ্রামে নিজের জায়গায় একটি পাকা ঘর করে সেখানে একটি মুদি দোকান খুলে বসেছেন। চাকুরী হবার পর সেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এখন দুলালী তার ছোট ভাইকে বসিয়েছেন।
ইতোমধ্যে দুলালী অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে অবশেষে খয়েরবাড়ী দাখিল মাদ্রাসায় অফিস সহকারি হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেছেন।
ব্রাক ও সিঙ্গারের যৌথ প্রযোজনায় ২ বছর মেয়াদী প্রজেক্টটি বন্ধ হবার পর নিজ বাড়িতে পাঁচটি সেলাই মেশিন নিয়ে গত দুই বছরে পাঁচশত গ্রামীণ অসহায় নারীদের স্বাবলম্বী হতে সেলাই প্রশিক্ষণ ও বুটিকের কাজ শিখিয়েছেন। এরপর তাদের সনদের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন সংগ্রামী নারী দুলালী। তাদের বেশিরভাগই নারী এখন নিজেরাই জীবিকা নির্বাহ করছেন।
সংগ্রামী নারী দুলালীর কিবা এমন বয়স হয়েছে। ৩২ বছর বয়সে বিধবা হলেও বিয়ের বিষয়টি তার মাথায় নেই।তার স্বপ্ন!সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের প্রশিক্ষিত করে সামনে দিকে এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি নিজের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করা ও সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করা।
 সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা গ্রাম বিকাশের "আলো প্রকল্প"থেকে প্রশিক্ষক হিসেবে যোগদান করতে তাকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এজন্য সে ওই সংস্থার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন।
 প্রশিক্ষিতদের মধ্যে সায়মা আক্তার নামে এক বাকপ্রতিবন্ধী নারীও ছিল। সেও এখন এখান থেকে কাজ শিখে উপার্জন করে পরিবারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর দাবির মুখে দুলালী ইতিমধ্যে পবিত্র কোরআন শিক্ষা কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন। এলাকায় যেসব মা-বোনেরা পবিত্র কোরআন শরীফ পড়তে জানেন না, তাদেরকে নিয়মিত নিজ বাড়িতে পবিত্র কোরআন শরীফ শিক্ষা দান করছেন।
উল্লেখ্য, এলাকার বেলি বেগম নামের এক বৃদ্ধা শ্রবণ প্রতিবন্ধী।তার ভিশন শখ, পবিত্র কোরআন শরীফ শিক্ষা গ্রহণ করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিবে। দুলালী চিন্তায় পড়ে যায়। সে ভাবে, এই বৃদ্ধাকে পবিত্র কোরআন শরীফ শিক্ষা গ্রহণ করতে হলে তার কানের মেশিনের প্রয়োজন। আশ্চর্য হলেও সত্য!দুলালী থেমে থাকেনি। সে ওই বৃদ্ধাকে জেলা প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে যোগাযোগ করে সরকারি ভাবে তাকে একটি কানের মেশিন পাইয়ে দিয়েছেন। এখন ওই বৃদ্ধা মা মেশিনের সাহায্যে দুলালীর কাছে পবিত্র কোরআন শরীফ শিক্ষা গ্রহণ করছেন। অবশ্য এই ঘটনাটি ইতিপূর্বে অনেক গণমাধ্যমে এসেছে।
আমাদের পিছিয়ে পড়া সমাজ টাকে এগিয়ে নিতে দুলালীদের মত সংগ্রামী নারীদের উৎসাহ দিয়ে পাশে থাকতে হবে। তবেই দুলালীদের মত  জয়িতাদের সংখ্যা দিন-দিন বৃদ্ধি পাবে। তখন হয়তো আমাদের এই পিছিয়ে পড়া সমাজটাও দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।জয়তু দুলালী....
Default Ad Banner

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *