শিরোনাম

11 May 2021 - 02:10:07 pm। লগিন

Default Ad Banner

না ফেরার দেশে আলোকিত মানুষ নওয়াব আলী মন্ডল

Published on Sunday, August 25, 2019 at 9:38 pm 254 Views

গোলাম কবির বিলু, পীরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি ঃ
৮২ বছরের নওয়াব আলী মন্ডল। নামের সাথে রয়েছে তাঁর নবাবী ভাব। পৈত্রিক এবং
ক্রয়কৃত জমি দান করে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একের পর এক ধর্মীয়, শিক্ষা ও
সামাজিক প্রতিষ্ঠান। নিজেকে নির্লোভ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
একজন দাতা, শিক্ষানুরাগী, আলোকিত মানুষ হিসেবে যার খ্যাতি রয়েছে। জীবন
সায়াহ্নেও তাকে ৩য় বারের মতো ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেছেন
ইউনিয়নবাসী। তিনি উপজেলার ১নং চৈত্রকোল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। তাঁর
ইউনিয়নের মৌজা সংখ্যা ২১।
পারিবারিক পরিচিতি ঃ
১৯৩৭ সালে উপজেলার চৈত্রকোল ইউনিয়নের হাজীপুর গ্রামের সম্ভ্রাস— মুসলিম
পরিবারে জন্মগ্রহন করেন নওয়াব আলী মন্ডল। বাবা এনায়েত আলী মন্ডল, মাতা-
খোদেজা বিবি। ২ ভাই, ১ বোনের মধ্যে বড় তিনি। সংসার জীবনে তার ২ স্ত্রীর
গর্ভে ২ ছেলে ও ৬ মেয়ে জন্মেছে। সামাজিক জীবনের মতোই পারিবারিক
জীবনেও আলোকিত মানুষ তিনি।
শিক্ষাঃ
বাড়ীর পার্শ্ববর্তী গ্রাম ঝাড়বিশলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২য় শ্রেনী,
ভেন্ডাবাড়ী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩য় থেকে ৫ম, মিঠাপুকুরের শুকুরের হাট
উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেনী এবং মিঠাপুকুরের বালুয়া উচ্চ বিদ্যালয়
থেকে ১৯৫৪ সালে এসএসসি পাশ করেন। এরপর আর পড়া এগোয়নি। বাবার সাথে
ছোট বেলা থেকেই গ্রাম্য শালিস দরবারে যেতেন। পরবর্তীতে সেই অভিজ্ঞতাই
কাজে লাগে তাঁর।
জনপ্রতিনিধি ঃ
এসএসসি পাশের পর মাত্র ২২ বছরে ১৯৬০ সালে ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর
১৯৭৩, ১৯৮৮ এবং ২০১১ সালে তিনি ওই ইউপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
মজার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। আপন মামা ‘তকের প্রধান’ কে পরাজিত করে ইউপি
সদস্য হন। বর্তমানে বয়সের ভারে ন্যুজ তিনি। তারপরও বিচার, শালিস, দরবারে যথেষ্ট
বিচক্ষণতা রয়েছে। তাঁর কাছে বিচার প্রার্থী বাদী-বিবাদী উভয়েই থাকেন
তটস্থ। খুব কড়া এবং ন্যায় বিচার তার। যে কারণে ইউনিয়নটিতে সামাজিক
অপরাধের মাত্রাও কম। একজন শাসক হিসেবে যথেষ্ট খ্যাতিও অর্জন করেছেন। এখনও
অনেকে সম্মান- শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর সামনে কেউ ধুমপান করেন বলেন জানা যায়।
প্রতিষ্ঠান স্থাপন ঃ
ইউপি সদস্য নির্বাচিত হয়েই ৬০ এর দশকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নির্মান
কাজে হাত দেন। ১৯৬০ সালে ইউপি অফিস ঘর ও সীড ষ্টোর নির্মান করেন। তিনি
১ একর জমি দান করে দানিসনগর উচ্চ বিদ্যালয়, ৭৫ শতক জমি দান করে শাল্টি সমস
দীঘি উচ্চ বিদ্যালয়, ৩৩ শতক জমি দান করে দানিসনগর বেসরকারী প্রাথমিক

বিদ্যালয়, ৩৩ শতক জমি দান করে হাজিপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
করেন। পীরেরহাট রহমানিয়া ফাযিল মাদরাসাতেও জমি দিয়েছেন। এ ছাড়াও তিনি
হাজিপুর মহিলা দাখিল মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, কলোনীবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের
ঘর নির্মান করেন। উলে­খিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিবারের কিংবা কোন আত্মীয়-
স্বজনকে চাকরীর সুবিধা নেননি। সাধক কবি কাজী হেয়াৎ মামুদ রামচন্দ্রপুর
জামে মসজিদে নামাজ আদায় করতেন, সেটিও ১৯৬০ সালে নির্মান করেন। ইটের
তৈরী বাড়ী করতে যতবার উদ্যোগ নিয়েছেন। তত বারই তা ভেঙ্গে গেছে। ইটের ঘর-
বাড়ী নির্মান করতে ইট ক্রয় করে এনেছেন বটে কিন্তু তা করা হয়নি। কারণ
মসজিদ, মাদরাসা এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তার কাছে সাহায্য
চাইতে আসায় ক্রয়কৃত ইট দিয়েছেন। যে কারণে থাকেন মাটির ঘরে। পাশাপাশি
তাঁর প্রায় দেড়’শ একর জমিতে বর্গা চাষীরা আবাদ করলেও তার শষ্য নামকাওয়া¯ে—
নেন।
প্রিয় ব্যক্তিত্বঃ
সাধক কবি কাজী হেয়াৎ মামুদ’এর জীবন-আদর্শ লালন করেন তিনি। তবে কবি-
সাহিত্যিকদের যথেষ্ট ভালবাসেন এবং কদরও করেন।
ভিন্ন অভিজ্ঞতা ঃ
ইসলামী সংগীত ও গান ভাল জানেন এবং প্রতিযোগীতায় ১ম স্থানটি তাঁর
থাকতো। তবে অশ­ীলতার কারণে যাত্রা গান শুনতেন না। কথাচ্ছলে বেশ কয়েকবার
তিনি ভাওয়াইয়া শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের গান বলেছেন। প্রিয় গান আমায় এত
রাতে কেন ডাক দিলি, প্রান কোকিলারে, নিভা ছিল মনের আগুন রে...’। ‘ফান্দে
পড়িয়া বগা কান্দেরে...’। যদি বন্ধু যাবার চাও, ঘাড়ের গামছা থুইয়া যাও রে...’।
জনপ্রিয় এমন অনেক গান গেয়ে শোনান। কিন্তু বয়সের কারণে দম আটকে যায়
তাঁর।

নওয়াব আলী মন্ডল জানান- মধ্যযুগের সাধক কবি হেয়াৎ মামুদ এর জন্মভুমি এই
ইউনিয়নের ঝাড়বিশলা গ্রামে। তিনি তাঁর লেখায় আক্ষেপ করে শিক্ষাকে প্রাধান্য
দিয়ে সমাজের অন্ধকার দিক তুলে ধরেছেন। উপজেলার মধ্যে অনগ্রসর এই
ইউনিয়নকে এগিয়ে নিতে শিক্ষার আলো ছড়ানোর জন্য জনপ্রতিনিধি হয়ে
জমি দান করে শিক্ষিা প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে হাত দেই। জীবনে কম হেসেছি।
মানুষের জন্য চিন্ড়া করেছি বেশী। জীবনের শেষ পর্যন্ত— মানুষের সেবা করতে
চাই। আমি মানুষের মাঝে বেঁচে থাকতে চাই।
তিনি দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত কারণে শয্যাশায়ী থাকার পর ২৫ আগষ্ট বিকেল
পৌনে ৪ টার সময় নিজ বাড়ীতেই মারা যান।

Default Ad Banner

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *